কাগজ তৈরির রাসায়নিক উপাদান

মানব সভ্যতায় কাগজের অবদান

মানব সভ্যতায় কাগজের অবদান
মানব সভ্যতায় কাগজের অবদান

সভ্য সমাজে কাগজে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।  সভ্যতার  ক্রম বিকাশে কাগজের অবদান অনস্বীকার্য।  এখন কাগজ ব্যতীত এক মুহূর্তও চলে না।  কাগজ না থাকলে অনেক কিছুই মানুষকে হারাতে হতো।  এ কারণেই বলা হয় কাগজ মানুষের আবিষ্কারের উৎকৃষ্ট অবদান।  বর্তমান সভ্য থেকে কাগজের সভ্যতা বলা যায়।  কারণ কাগজ আবিষ্কারের ফলে একদিকে যেমন জ্ঞান বিজ্ঞানের দ্রুত প্রসার সম্ভব হয়েছে তেমনি মানুষ তার চিন্তা ভাবনাকে স্থায়ীভাবে প্রকাশ করতে  সমর্থ হয়েছে। কাগজ আবিষ্কারের আগে মানুষ তার চিন্তা ভাবনাকে পশুর চামড়া, ভুজপত্র, গাছের ছাল, ইট, পাথর, দাতব পত্র প্রবৃত্তিতে লিপিবদ্ধ করতো। বর্তমানে এ সমস্যা সমাধান হয়েছে।  এখন পৃথিবীর চিন্তাশীল ভাবুক কবি ও দার্শনিকের অমূল্য ভাব সম্পাদকের কাগজ তার বক্ষে ধারণ করে অক্ষয় করে রেখেছে এবং বিশ্বের বিদ্বানুরাগী হৃদয়ের সূত্র স্থাপন করেছে।  সুতরাং মন সভ্যতার ইতিহাসে কাগজের অবদান সীমাহীন। 

কাগজের আবিষ্কারঃ  কাগজের আবিষ্কার হয় সর্বপ্রথম চীন দেশে।  ভারতীয়রা চীন দেশ থেকেই কাগজ তৈরির পদ্ধতি শিখেছিল।  চীনের পরে ইউরোপে কাগজ তৈরির পদ্ধতি চালু হয়।  ১৭৯৮ সনে রবার্ট লই নামক ফ্রান্সের এক ভদ্রলোক কাগজের কল আবিষ্কার করেন।   এরপর থেখেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন শুরু হয়। ভারতবর্ষে প্রথমে তোলা গাছের পাতা ও  খড়কুটো দ্বারা কাগজ প্রস্তুত হতো। তুলা থেকে প্রস্তুত কাগজকে তুলোট কাগজ বলা হত। 

মানব সভ্যতায় কাগজের অবদান
মানব সভ্যতায় কাগজের অবদান

কাগজ তৈরির প্রণালীঃ  আধুনিককালে ছেড়া কাপড়, বাঁশ, কাঠ, ঘাস, পাটকাঠির ছোবড়া প্রভৃতি থেকে যন্ত্রের সাহায্যে কাগজ তৈরি হচ্ছে। দেশে-বিদেশে তৈরি হচ্ছে বড় বড় কাগজের কারখানা।  বড় বড়  বাঁশকে খন্ড খন্ড টুকরো করে বড় চৌবাচ্চায় এগুলোকে ভিজিয়ে সিদ্ধ করে মন্ড তৈরি করা হয়।  মন্ডের সাথে জিলেটিন, রজন, ফিটকিরি প্রভৃতি রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে কলের চাপে পাতলা কাগজ তৈরি করা হয়। পাশ্চাত্য ছাগল, মেষ প্রভৃতি পশুর চামড়া দিয়ে ভেনার্স বা পার্টমেন্ট নামে এক ধরনের কাগজ তৈরি হয়। আমাদের দেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলে তোলা, আখের ছোবড়া,পুরাতন কাপড় প্রভৃতি হতে জাতীয় কাগজ তৈরি করা হয়। পাটমেন্ট কাগজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল।  কাগজের নোট এবং দলিলপত্র প্রভৃতি এ কাগজ দ্বারা তৈরি করা হয়।

বাংলাদেশের কাগজ শিল্পঃ  বাংলাদেশে বেশ কিছু কাগজের মিল রয়েছে।  কর্ণফুলী পেপার মিল ও পাকশি পেপারে মিলে সাদা কাগজ এবং খুলনা পেপার মিলে নিউজ পেইন্ট কাগজ প্রস্তুত হয়। এখন বাংলাদেশে কাগজের চাহিদা পূরণে সক্ষম।  কারণ আমাদের দেশে কাগজ তৈরির কাঁচামালের অভাব নেই।  এর জন্য বাঁশ, শুকনোপাতা, ঘাস, তৃণ প্রভৃতি যেসব বস্তুর দরকার সেগুলো অতি শীলো বিয়ে ও সহজে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। বর্তমান যান্ত্রিক যুগেও হাতে তৈরি কাগজ সম্পন্নরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।  চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ কোন বহু লোক ন্যাকড়া, তোলা ও আখের শুভ্র দিয়ে এক ধরনের কাগজ প্রস্তুত করে থাকে।  আমাদের দেশে কাগজি নামে এক সম্প্রদায়ের লোক  তোলোট কাগজ তৈরি করে থাকে।

মানব সভ্যতায় কাগজের অবদান
মানব সভ্যতায় কাগজের অবদান

কাগজের প্রকারভেদঃ  কাগজ নানা প্রকার, নানা আকার ও নানা রঙ্গের হয়ে থাকে। এদের মধ্যে কত রঙ্গিন, কত সাদা, কতক পাতলা, কতক মসৃণ এবং কত অমসৃণ। এদের প্রত্যেকটির গুণ ও মূল্যের মধ্যে যথেষ্ট প্রভেদ রয়েছে।  দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য যে কাগজ ব্যবহার করা হয় তাকে ফুলস্কেপ কাগজ বলে। ডবল ক্রাউন, রয়েল, ডিমাই প্রভৃতিক আকারের কাগজ বইচাপার কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সংবাদপত্রে যে কাগজের ওপর চাপা হয় তাকে নিউজপ্রিন্ট বলে।  তা ছাড়া ছবি আঁকা,ফটো তোলা, ঘরবাড়ি সাজানো প্রভৃতির জন্য নানা রকমের কাগজ তৈরি হয়ে থাকে।

মানব সভ্যতায় কাগজের অবদান
মানব সভ্যতায় কাগজের অবদান

কাগজের প্রয়োজনীয়তাঃ  বর্তমান সভ্যতার সাথে কাগজে সম্পর্ক অবিচ্ছেদ।  আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কাগজের প্রয়োজনের কথা বলে শেষ করা যায় না।  বর্তমান যুগে শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম কাগজ। শিল্প ও সভ্যতার বিস্তারের সাথে সাথে কাগজের চাহিদা বেড়ে চলছে। কাগজ ছাড়া কোন কিছু লেখা ও মুদ্রণ অসম্ভব। কাগজ ছাড়া আমাদের আজকাল একদিনও চলে না।  কাগজ আবিষ্কারের আগেরকার মানবজাতির ইতিহাস আজও আমাদের কাছে রহস্যের বিষয়বস্তু হয়ে রয়েছে।  কিংবদন্তিতে বলে টালিতে লেখা হযরত মুসার তৌরিত গ্রন্থ। যা বহন করতে ১৪ টি উটের প্রয়োজন হতো। আজ কাগজের কল্যাণে ১৪ হাজার তৌরিত বয়ে নিতে শুধু একটা উটের দরকার হয়ে থাকে।  শিক্ষা দীক্ষার কাজ ছাড়াও গৃহসজ্জা, মোরক ও থলে তৈরি ইত্যাদি আরা কাজে কাগজ ব্যবহার করা হয়।  বর্তমানে জাপানে কাগজের সাহায্যে বসবাসের জন্য ঘর প্রস্তুত হচ্ছে। 

কাগজ ছাড়া বর্তমান সভ্য সমাজ কল্পনা করা যায় না।  জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রে কাগজ একটি প্রয়োজনীয় উপাদান।  কাগজ ছাড়া অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্য অচল। মোটকথা,  কাগজ বিশ্ব মানবহৃদয়ে যুগসূত্র রচনা করেছে। মানব জীবনে হাসি-কান্না, সুখ দুঃখের বাহন কাগজ। সুতরাং প্রত্যেক দেশের সরকারের কাগজ উৎপাদন এবং তা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখার প্রতি দৃষ্টি রাখা কর্তব্য।

Views: 6

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *