মাদকদ্রব্য ও তার প্রতিকার

মাদকদ্রব্য ও তার প্রতিকার

মাদক দ্রব্যের ক্ষতিকর প্রভাব
মাদক দ্রব্যের ক্ষতিকর প্রভাব

নেশা করার প্রবণতা বহু আদি কাল থেকে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে ম্যাচে একটি সামাজিক ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে এবং সারা বিশ্বে একটা আয়োজন সৃষ্টি করেছে। বর্তমান যুগে মাদকাসক্তির যুগ বলা হয়। মাদকাসক্তি এমন একটি  দূর্বার নেশা যাতে একবার অভ্যস্ত হয়ে গেলে তা পরিত্যগ করা খুবই কঠিন। মারাত্মক আসক্তি ব্যক্তিজীবনের যেমন সর্বনাশ সৃষ্টি করছে তেমনি জাতীয় পরিণামের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

 মাদকাসক্তি কি

বিভিন্ন নেশাদ্রব্য গ্রহণ করে নেশা করার প্রবণতায় মাদকাসক্তি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে ,প্রথম টানেই দেহে নিউরোকেমিক্যাল বা রাসায়নিক উপাদান বেরিয়ে মস্তিষ্ক কোষে একটা উত্তেজনা বা আরাম ও আমেজের অনুভূতি তৈরি করে। তার ফলেই অনুভূতির কাছে বারবার নিজেকে সমর্পণ করতে হয। মাদকদ্রব্য হিসেবে বহু উপকরণ রয়েছে যেমন মদ, গাজা, আফিম, ভ্যান, মারিজুয়ানা, এল এমডি, ফেনসিডিল, প্যাথেড্রিল, চরস, পপি, মরফি,ন হাসিম, হিরোইন, কোকেন, ক্যানাবিস, ব্রডেন ইত্যাদি। এসবের মধ্যে সাম্প্রতিককালে হিরোইনের জনপ্রিয় তা বৃদ্ধি পেয়েছে। যে সকল ওষুধের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে এবং দিনে দিনে যে সকল সেবনের প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এদেরকে মাদকদ্রব্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বিভিন্ন প্রকার মাদকদ্রব্য আছে তবে বহুল স্বীকৃত। শ্রেণীবিভাগ তিনি নিম্নরূপ-

 ০১। নির্ভরকর্ষক বা seductive

 ০২। উত্তেজক বাস স্টিমুল্যান্ড

 ০৩। আমূল প্রত্যক্ষের অভিজ্ঞতা সৃষ্টিকারী বা হ্যাসু-সিনোজেনিক

 ০৪। ফেনসিডিল

   মাদকাসক্তির কারণ

মাদকাসক্তির পিছনে বহু কারণ বিদ্যমান। অনেকের জীবনে ব্যর্থতা, হতাশা, বিষাদ, নতুনদের নেশা এসব থেকেই প্রথমে নেশা শুরু করে এবং পরবর্তীতে নেশাগ্রস্ত হয়ে গেলে তার গতি বৃদ্ধি পায় নিজের তাগিদেই। অনেক সময় শিক্ষা জীবনের অনিশ্চয়তা, বেকারত্বের অভিশাপ, দারিদ্র্যের গ্রাস, মাদকাসক্তির জন্য দায়ী। এছাড়া ব্যক্তিগত পারিবারিক জীবনের অস্থিরতা, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব,মন্দদোষ, কাল টাকার উত্তাপ, ব্যয়ের অপরিচ্ছন্ন পন্থা তরুণ সমাজকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে তথা মাদকাসক্ত করছে।

মাদক দ্রব্যের পাচার ও চোরাচালান

বিশুদ্ধ মাদকদ্রব্য প্রসারে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ৫৪ ও চোরাচালান সুসংবদ্ধ নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে বর্তমানে সারা পৃথিবীতে মাদকদ্রব্য চোরাচরনের জাল বিস্তৃত। পারস্পরিক স্বাস্থ্য সংরক্ষণকারী চক্রের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য প্রচারে তথ্য যোগান দেওয়া থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত এর নেটওয়ার্ক  সক্রিয়। ভৌগলিক দিক থেকে মাদকদ্রব্য উৎপাদনে ও পাচারের জন্য আমেরিকা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো ছাড়াও এশিয়ার তিনটি সীমান্তে পয়েন্টে ১) গোল্ডেন ট্রাঙ্গেল- মায়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড সীমান্ত, ২) গোল্ডেনওয়েজঃ আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইরান সীমান্ত,৩) গোল্ডেন ক্রিসেন্টঃ বাংলাদেশ,নেপাল ও ভারত সীমান্ত চিহ্নিত হয়েছে।

 মাদকের শক্তির ক্ষতিকর দিক

মাদক দ্রব্যের আসক্তি সুপ্রাচীন কাল থেকে তখন থেকে। এটি সমস্যার সৃষ্টি করে আসছে। একসময় চীনেরা আফরিমা আসক্ত হয়ে পড়েছিল। সাম্প্রতিককালে মাদকাসক্তি বহু লোকের বিশেষত তরুন সমাজকে ধ্বংস সৃষ্টি করছে। সৃষ্টি করছে এক ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের। মাদকাসক্তি শুক্ষভাবে দেহের নানা ক্ষতি করে এবং একপর্যায়ে দেহ তার প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্নরূপে হারিয়ে ফেলে। মাদকাসক্তি বহু ধরনের রূপ বেধে সৃষ্টি করে। মাদকাসক্তি শারীরিক অক্ষমতা বৃদ্ধি মানসিক ভারসাম্যহীনতা অপ্রচলিতা সৃষ্টি করে এবং মাদকাসক্ত অকাল মৃত্যু ডেকে আনে।

মাদকের শক্তির ফলে মেধা নষ্ট হয়, নেশায় রোগাক্রান্ত হয়, নেশাগ্রস্ত লোকের ব্যক্তিত্বের অবলুপ্তি ঘটে এবং স্বাভাবিক জীবনে বেঁচে থাকার ও দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে। মাদকাসক্তি জীবন ব্যক্তিজীবনকে টেনে দিয়ে ব্যর্থতার খবর এবং জাতীয় জীবনে নিয়ে আসে সর্বনাশ।

 মাদকাসক্তির প্রভাব

বর্তমান বিষয় জন্য মাদকের শক্তি আজ হুমকি স্বরূপ। বিশ্বের এমন কোন দেশ নেই যেখানে মাদকতার কালো ছায়া বিস্তার করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ জীবনে মাদক এক নম্বর সমস্যা। মাদক তার থাবা ধীরে ধীরে বিস্তার করে চলছে। নিম্নের ডাটা থেকে তা সহজে অনুমান অনুধাবন করা যাবে-

 ০১। হিরোইন ১৯৭৯ শতকরা হার ৩৬

             ১৯৮৩ শতকরা হার ৫৮

 ০২। কোকেন ১৯৭৭ শতকরা হার ১

           ১৯৮৪ শতকরা হার ১৮

মাদকের প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ সমাজ। মাদকের শক্তির প্রভাবে যুব সমাজের ওপর নিয়ে নৈতিক অধঃপতন ঘটছে। সুখ সাচ্ছন্দের জীবন বিসজির্ত হচ্ছে। অনেকেই অকালে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে। মাদকদ্রব্যের হিংস্রতা বিস্ময় সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর উপর বহুমুখী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। মাদকাসক্তরা পরিবার ও জাতির ভয়াবহ সর্বনাশা সাধন করছে। মাদকাসক্তি ও অপরাধ প্রবণতার মধ্যে রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে- মাদকাসক্তি ও অপরাধ প্রবণতা পাশাপাশি চলে। মাদকদ্রব্যের দাম খুব বেশি বলে তার সংগ্রহের জন্য বিপুল অর্থ বের করতে হয়। তাই নেশাগ্রস্তরা অবৈধ উপার্জনের তৎপর হয়। মাদকের উপর ভিত্তি করি গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক চোরাচালানকারী চক্র। চোরাচালান দেশের অর্থনীতি কে মারাত্মকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। 

প্রতিকার

মাদকের শক্তি অসমজের রন্ধে রন্ধ্রে সমস্যা সৃষ্টি করছে। তাই এর ব্যবহার বন্ধ করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে ।সারা বিশ্বের আজ মাদক প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতার সৃষ্টি হয়েছে। গড়ে উঠেছে মাদিক বিরোধী নানা সংগঠন। তারা মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরছে। বর্তমানে প্রতিকারের দুটি পন্থা বিবেচনা করা হচ্ছে। একটি হচ্ছে নেশাগ্রস্থদের চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়োগ করা এবং নতুন নেশায় আক্রান্ত না হওয়ার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অপরটি হচ্ছে মাদকদ্রব্যের উৎপাদন ও ব্যবসা বন্ধ করা।

মাদকের শক্তির হার তরুণ সমাজে বেশি। সেজন্য তরুণ সমাজকে নৈতিক মূল্যবোধে উদ্ভূত করতে হবে। তাদের শিক্ষার সুব্যবস্থা করতে হবে এবং বেকারত্বের অবসান ঘটানোসহ ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে উজ্জ্বল ধারণা দিতে হবে। তরুণ সময় যাতে জীবন গঠনের আদর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয় সেজন্য অভিভাবক, শিক্ষক, সমাজ সেবক, রাজনীতিবিদ প্রমুখ সবার সচেতন হতে হবে। প্রচারের মাধ্যমে মাদকাসক্তির কুফল সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারে অভিযান চালাতে হবে। আরো বেশি মাদক বিরোধী সংগঠন গঠন করে জনসাধারণকে আরও বেশি সচেতন করতে হবে। সর্বপরি মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। মাধক প্রতিরোধের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে এবং পারিবারিক ও সামাজিকভাবে প্রতিরোধের উদ্যোগ নিতে হবে ।মাদক উৎপাদন এর সঙ্গে অনেক শক্তিশালী চক্র জড়িত উৎপাদনের জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিষেধ করতে হবে।

 

মাদকাসক্তির ব্যাপক সমপ্রসারণ আজ জাতীয় বিশ্বকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে মাদকাসক্তি। আশার কথা হচ্ছে বিশ্ব আজ মাদক বিরোধী তৎপরতা শুরু হয়েছে। এ তৎপরতাকে আরো জোরদার করতে হবে। সাথে সাথে আনুষঙ্গিক সমস্যা গুলির সমাধান করা অবশ্যক। তাই সমাজ থেকে এদের বিতাড়িত করতে হবে। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সচেতনতার সৃষ্টি করতে হবে। মাদক বিরোধী সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। তরুণদেরকে একঘেয়েমি, গতানুগতিকর নিষ্প্রভ পরিবেশ থেকে টেনে আনতে হবে উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় মেরুবলয়ের দিকে। তবেই আমরা এ মহাঘাতকের হাত থেকে মুক্তি পাবো। 

Views: 13

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *