বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদান

Table of Contents

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদান

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদান
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদান

রবীন্দ্র নাথ আধুনিক বাঙালি সৃষ্টিশীলতার অসামান্য ঐতিহ্য এই মহান পূর্বসূরী শক্তি ও সীমাবদ্ধতার উপলব্ধি আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা। জীবন ও জগতের জানা ও বোঝার অসম্ভব ব্যর্থতা নিয়ে তিনি আমরণ সাহিত্য সাধনা করে গেছেন। ১৯ শতকের মধ্যভাগে বাংলার জাগরনের যুগে যে কজন মহামানবের জন্ম হয়, রবীন্দ্রনাথ তাদের অন্যতম। তিনি বাংলা ভাষাকে সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধে তুলে বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার প্রতিভা যেমন ছিল অতল স্পর্শী, তেমনি ব্যাপক। বাংলা সাহিত্যের এমন কোন শাখা নেই যেখানে তার প্রতিভার স্পর্শ  পড়েনি।

জন্ম ও বাল্যকাল  ১৮৬১ সালে জিজ্ঞাসা কোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন।  তার পিতার নাম মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাতার নাম সারদা দেবী।  পিতা মাতার যৌথ দর্শন সন্তান ছিলেন তিনি। বড় পরিবারের অনেক লোকের ভিড়ে রবীন্দ্রনাথ মাতা পিতার আদর শাসন পাননি তেমন।  অসহ্যমন্ডিত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তার ভালো জীবন ছিল খুবই সাদা সিধা। ভোগবিলাসের আয়োজন ছিল না বললেই হয়। কাপড়চোপড় ছিল জোট সামান্য। বয়স ১০ এর কোটা পার হবার পূর্বে তিনি কোনদিন কোন কারণেই মৌজা পড়েননি। শীতের দিনে একটি সাদা জামার উপরে আর একটি সাদা জামায় ছিল তার যথেষ্ট।  তার ছুটি জুতা ছিল মাত্র এক জোড়া। আহারে শৌখিনতার গন্ধও ছিল না। দিন  কাটতো চাকরদের মহলে। ভালো জীবন প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন ভারতবর্ষের ইতিহাসে দাস রাজাদের রাজত্বকাল সুখের কাল ছিল না। আমার জীবনের ইতিহাসেওদের শাসনকালটা যখন আলোচনা করে দেখি তখন তাহার মধ্যে মহিমা বা আনন্দ কিছুই দেখতে পাই না। এ সকল রাজাদের পরিবর্তন বারংবার ঘটিয়েছে কিন্তু আমাদের ভাগ্যে সকল খালি নিষেধ ও প্রহারের ব্যবস্থা বই লক্ষণ ঘটে নাই। তখন এ সম্বন্ধে তথ্য আলোচনার অবসরে পাইনাই পিঠের যাহা পড়িত তাহা পিঠে করিয়া লইতাম এবং মনে যা জানিতাম সংসারে ধর্মই এই বড় যে সে মারে ছোট যে সে মার খায়। এমনিভাবে চাকরদের কঠোর তত্ত্বাবধানে খাঁচার পাখির মতোই কেটেছে তার বাল্য জীবন।

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদান
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদান

রবীন্দ্রনাথের পড়াশোনা শুরু হয়েছিল গৃহ শিক্ষকের কাছে পারিবারিক পরিবেশে। খুবই কম বয়সে কান্নার জুড়ে ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি বছরখানেক পর, নরমাল স্কুলে এত পর নরমাল স্কুল ত্যাগ করে ভর্তি হলেন বেঙ্গল একাডেমী নামক ফিরিঙ্গি স্কুলে। বেঙ্গল একাডেমির পরে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন সেন্ড জেভিয়ার্স স্কুলে।  কিন্তু স্কুলের বাধা ধরা পরিবেশে তার ভালো লাগতো না, অনেক স্কুল পালানো তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছিল। স্কুলের নিরানন্দ শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ ছিল না মোটেই। তিনি গৃহ শিক্ষকের নিকট বাংলা ও ইংরেজি ভাষার গভীর জ্ঞান লাভ করেন। ভারতীয় দর্শন ও উপনিষদে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন পিতার নিকট থেকে। ১৭ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ভ্রাতা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে অধ্যয়নের জন্য বিলাদ গমন করেন কিন্তু সেখানেও তার লেখাপড়া খুব বেশি এগুলো না। প্রথমে ব্রিটেনে একটি পাবলিক স্কুলে, পরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করে মাত্র দেড় বছর পর তিনি দেশে ফিরে আসেন।

বাংলা সাহিত্যে তার অবদান

 আধুনিক বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদান ও প্রভাব উভয়ই অপরিসীম। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের তিনি এর উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। রবীন্দ্র প্রতিভা স্পর্শে বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য খুঁজে পাই আলো উজ্জল নতুন দিগন্তের সন্ধান। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখা তার লুকাত্তর প্রতিভার স্পর্শে ধন্য হয়েছে। রবীন্দ্র সাহিত্যের ভান্ডার বিশাল বিস্তৃত। এমন কোন দিক নেই যে দিকে তাকালে রবীন্দ্রনাথ দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে যান। তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন শিশুকাল থেকেই ১২-১৩ বছর বয়সে। তার লেখা পত্রিকায় প্রকাশ হতে থাকে। মাত্র ১৪ বছর বয়সেও প্রকাশিত হয় তার “বনফুল’’ কাব্য। এরপর কবি কাহিনী, সন্ধ্যা-সঙ্গীত, ঠাকুরের পদাবলী প্রভৃতি একটি পর একটি প্রকাশ হতে থাকে। রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে এই বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যে সবদিকে যৌবনপ্রাপ্ত হয়ে বিশ্বের দরবারে স্বগৌরবে নিজের আসন প্রতিষ্ঠা করে। কাব্য, ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান ইত্যাদি প্রত্যেক বিভাগেই তার অবদান অজস্র এবং অপূর্ব। তিনি একাধারে সাহিত্যিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সুরক্ষার, নাট্য প্রযোজক এবং স্বদেশপ্রেমিক। বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতিও ছিল তার অসাধারণ আগ্রহ। তা রচিত গানের পরিমাণ ২০০০ এর অধিক। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে “গীতাঞ্জলি’’ কাব্যের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। সন্ধ্যা সঙ্গীত, প্রভাত সঙ্গীত, ছবি ও গান, কড়ি ও কোমল, মানসী, সোনার তরী ,বিদায়, অভিশাপ, চিত্রা, চৈতালি, কণিকা, কল্পনা ,ক্ষণিকা, নৈবেদ্য, স্মরণ, শিশু উৎসর্গ, কেয়া, গীতাঞ্জলি, বলাকা বনবাণী, পূরবী, পুনশ্চ, মহুয়া, আরোগ্য, জন্মদিনের, শেষ লেখা প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য কাব্য। বউ ঠাকুরানীর হাট, রাজর্ষি ,চোখের বালি, নৌকাডুবি ,ঘোরা, ঘরে-বাইরে, চতুরঙ্গ, যোগাযোগ, শেষের কবিতা, দুই বোন, মালঞ্চ, চার অধ্যায় প্রভৃতি তা রচিত উপন্যাস। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ছোট গল্পের রূপকার। চার খন্ডে প্রকাশিত তার ছোট গল্প গ্রন্থ গল্পগুচ্ছ। বিসর্জন, ঘোড়ায় গলদ ,প্রায়শ্চিত্ত, রাজা ,অচলায়তন, ডাকঘর, রক্তকরবী ,তাসের দেশ, চণ্ডালিকা ও চিত্রাঙ্গদা তার উল্লেখযোগ্য নাটক ও প্রহসন। আত্মশক্তি ভারত বর্ষ সাহিত্য আধুনিক সাহিত্য প্রাচীন সাহিত্য, লোকসাহিত্য, স্বদেশ, সমাজ, শিক্ষা, শব্দ, তত্ত্ব সংকলন, সাহিত্যের পথে, কালান্তর ইত্যাদি তার বিখ্যাত প্রবন্ধ গ্রন্থ। এছাড়া তিনি রচনা করে গেছেন বেশ কটি ভ্রমণ কাহিনী, জীবনী গ্রন্থ, আত্মজীবনী ইত্যাদি যা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। 

সমাজ সেবামূলক কাজ

 রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ সময় সংস্কারক, পরহীতব্রতি,খাঁটি দেশপ্রেমিক। তিনি জাতিকে প্রেরণা দিতেন সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে। পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে নিরীহ ভারতবাসীর উপর ব্রিটিশ সরকারের ও মানসিক জুলুমের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত “স্যার’’ উপাধি অর্জন করে দেশ প্রেমের পরিচয় দেন। শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি কৈলপুরে স্থাপন করে গেছেন বিশ্বভারতী। বিশ্বভারতী বর্তমানে ভারতের একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়। দুটি শাখা শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতন। শিক্ষার জন্য শান্তিনিকেতন একটি জ্ঞানকেন্দ্র, আর শ্রীনিকেতনহচ্ছে কর্মক্ষেত্র। বিশ্বভারতী তার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। 

রবীন্দ্রের যে সুইটি ধ্বনিত হচ্ছে তা পূর্ণতার সুর, পরিতৃপ্তির সুর।  এর পূর্ণতা অতৃপ্তি এসেছে অখন্ড নিস্বর্গানুভূতি হতে। প্রকৃত মানুষের প্রতি গভীর মনোতো বুধ তার কাব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সমগ্র গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখের ছবি এঁকেছেন তিনি ছোট গল্পের মাধ্যমে। উপন্যাস ও প্রবন্ধাবলীতে সমসাময়িক জীবন ও সমস্যা প্রতিফলিত হয়েছে।  সীমাহীন আনন্দলোকে প্রবেশ করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে তার গানে। বাস্তবিকই তিনি ছিলেন এক অনুসন্ধিৎসু শিল্পী। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে ২২ শ্রাবণ এ মহা মনীষী মত্যধাম হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেছেন কিন্তু মানব সমাজে চির স্মরণীয় হয়েছেন তার কালোজিরা সাহিত্যকর্ম।

Views: 9

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *