বাংলা সাহিত্যে নজরুল

Table of Contents

কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম
কাজী নজরুল ইসলাম

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ উত্তর সময়ে বিশ্বব্যাপী মূল্যবোধের অবক্ষয়, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বুর্জমা ও সমাজের চরম সংকট এবং পোড়ো জমিতে ফাঁপা মানুষের হতাশার প্রতিবেশে বাংলা কাব্যে কাজী নজরুল ইসলামের উজ্জ্বল আবির্ভাব। বাংলা সাহিত্যে তার আগমন। ধূমকেতুর মতো তিনি সকাল বিদ্ধর যুগম্বর কবি। তিনি যুগতীর্ণ বটে। বাংলা সাহিত্যের ভান্ডার কে তিনি দান করেছেন বিপুল সমৃদ্ধ। বৈষম্যমূলক উপনিবেশিক সমাজের পরিবর্তে তিনি কল্পনা করেছেন শোষণ মুক্ত গণতান্ত্রিক সুষম সমাজ। অসত্য অমঙ্গল ও অকল্যাণের রাহু গ্রাস থেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন স্বদেশের মাটিয়ার মানুষকে। যুদ্ধ তোর বিরুদ্ধে প্রতিবেশীর দাঁড়িয়ে তিনি গিয়েছেন জীবনের জয়গান, উচ্চারণ করেছেন উপনিবেশিক শক্তির শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য বিদ্রোহের সূর্য সম্ভব বাণী। তাই তিনি জাতীয় জাগরণের কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। স্বীকৃতি পেয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয়  কবির।

জীবন কথা

 কবি কাজী নজরুল ইসলাম বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রামে ১৩০৬ বঙ্গাব্দে ১১ই জ্যৈষ্ঠ তারিখে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ শে মে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ফকির আহমদ, মাতার নাম জাহেদা খাতুন। তার পিতা যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তার বয়স আট বছর। অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট, লাঞ্ছনা গুঞ্জনা ও অপমান মনস্তাপের মধ্য দিয়ে তার বাল্য, কৈশোর ও প্রাক যৌবন অতিবাহিত হয়েছে।  নির বিছিন্ন জীবন  সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সংগ্রামের দুঃসহ কঠোর বেদনার ঘায়ে নিরন্তর কত বিক্ষত হয়ে তাকে পদে পদে এগিয়ে চলতে হয়েছে। সংসারের উপার্জনের প্রয়োজনে অতি অল্প বয়সে সামান্য বেতনে সংগ্রামের মক্তবে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়। কিন্তু কোন কাজেই তিনি স্থির ছিলেন না। মক্তবের শিক্ষকতার কাজ ছেড়ে তিনি যোগ দেন লেটুর দলে। এই লেঠুর দলে যোগদানরি কাব্যজীবনে সুদূরপ্রসারী হয়েছে। এর ফলে তিনি নানাবিধ হিন্দু পুরাণের সাথে পরিচিত হন এবং তার কাব্যের পুরান প্রসঙ্গের অবতারণা এবং পৌরাণিক প্রতীক সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। অপরপক্ষে সম্পূর্ণ অমার্জিত অসংখ্য ও গ্রাম্য সাহিত্যের তার হাতে করেই হয়েছে বলেই পরবর্তী কাব্যজীবনে এর উর্ধ্বে ওঠা কখনো তার পক্ষে পুরো মাত্রায় সম্ভব হয়নি। তাই স্কুল ছেড়ে পালিয়ে এলেন রানীগঞ্জে। সেখানে রেলওয়ে বিভাগের এক গার্ড সাহেবের বাসায় বাবুজীর কাজ নেন। কিন্তু সেখানেও তার মন বসে নি, চলে গেলেন আসানসোলে। সেখানে কাজ নিলেন এক রুটির দোকানে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি হারমোনিয়াম, তবলা, বাসি ইত্যাদি বাজাতেন এতে আকৃষ্ট হতো দোকানের খদ্দের। সেখানে নজরুলের প্রতিভার পরিচয় পেয়ে রফিক উদ্দিন নামক জনক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য নিজ গ্রাম ময়মনসিংহ জেলার কাজী শিমলা গ্রামে নিয়ে আসেন এবং হরিরামপুর হাই স্কুলে ভর্তি করে দেন। কিন্তু সেখানেও তিনি বেশিদিন লেখাপড়া করেননি। দশম শ্রেণীতে অধ্যানরত অবস্থায় প্রাক নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে, প্রথম মহাযুদ্ধের আহবানে বাঙালি রেজিমেন্ট সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। এখানেই তার জীবনের নতুন একটা পর্বের সূচনা হলো ফারসি ভাষায় চর্চার প্রয়াস। তার মধ্যে প্রবল হয়ে দেখাতে  সৈনিক জীবনেই।সৈনিক জীবনে তার কল্পনাশক্তি আশ্চর্য রকমের উদ্দীপ্ত ও সচকিত হয়ে উঠে এবং তার সৃষ্টির প্রতিভা বিচলিত হতে থাকে গল্প জ্গান আর কবিতা। তার দু বছরের সেনা জীবন ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ মুলত করাচিতে কেটেছে। যুদ্ধ শেষে বাঙালি পল্টন ভেঙ্গে গেলে তার সৈনিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধ শেষে ১৯১৯ সনে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। অতঃপর কবি হিসেবে তিনি খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন কিন্তু নিতান্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, তিনি মাত্র বাইশ বছর সাহিত্যের সাধনা করতে পেরেছিলেন। ও পরিণত বয়সেই তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চিরদিনের মত নির্বাক হয়ে যান। ১৯৭৩ সনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ১৯৭৬ সালের ১৯শে আগস্ট তিনি পরলোক গমন করেন।

সাহিত্য সাধনা

কাজী নজরুল ইসলাম
কাজী নজরুল ইসলাম

 নজরুল ইসলাম বলুনতো রোমান্টিক কবি। রোমান্টিক সিজম মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী সংগ্রামী চেতনায়। রোমান্টিক অনুভবের তিনি প্রত্যাশা করেছেন সুসং সুন্দর কল্যাণময় সমাজ। তাই তিনি বিদ্রোহ করেছেন অন্যায় ও অসত্য এবং অসুন্দরের বিরুদ্ধে। কবিতায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে, সামন্ত প্রথা শাস্ত্রাচার আর সম্প্রদায়িকতার  বিরুদ্ধে। নজরুলের আশ্চর্য বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর সমগ্র জাতিকে লোক পুরাণের সোনার কঠিন স্পর্শে মুহূর্তেই উজ্জীবিত করেছে, করেছে সন্দীপিত। অত্যাচার, উৎপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী পুরুষ হিসেবে স্বাধীনতার স্বপক্ষে মুক্তি আন্দোলনের তুর্চবাদক সেনানি হিসেবে সর্বোপরি নিপীড়িত মানবতার কবি হিসেবে তিনি হয়েছেন নন্দিত হয়েছেন বড়মাল্য। পরাধীনতার বন্ধন থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় সচেতন ভারতবর্ষে যখন অবতীর্ণ হয়েছে কঠিন সংগ্রামে, ঠিক তখনই অগ্নিবীণায় বিদ্রোহের সুর  মূর্ছনা তুলেছেন নজরুল। বস্তুত অগ্নিবীণা নজরুলের প্রাতিম্ভিক কবি চৈতন্যের সামুহিক বৈশিষ্ট্য নিদর্শক। ভাব পরিমণ্ডল, জীবনার্থ এবং প্রকরণ প্রকৌশলী অগ্নিবীণা বাংলা কাব্য ধারায় এক সম্পূর্ণ নতুন নির্মাণ। অগ্নিবীণার বিদ্রোহী কবিতায় কবি নজরুল বলেছেন

“ আমি সেদিন হব শান্ত

 যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রুল আকাশে বাতাসে ধনী বেনা

 অত্যাচারের  খড়গ কৃপাণ  ভীম  রণভূমে  রণিবে না।’’

গল্প রচনার মধ্য দিয়ে শক্তিমান কবি নজরুলের লেখক জীবন আরম্ভ হয়। তার সর্বপ্রথম রচনা বাউন্ডুলের আত্মকথা। পত্রিকায় লিখিত তার প্রথম উপন্যাস বাঁধনহারা।  দোলনচাঁপা, ছায়ানট ,পূর্বের হওয়া প্রভৃতি তার প্রেমের কাব্য। অন্যদিকে,  ভাঙ্গার গান, বিষের বাঁশি, ফনিমনসা এসব কাব্যে তিনি বিদ্রোহের বাণী দেশবাসীকে উজ্জীবিত করতে চেয়েছেন। সামাজিক অনাচার, অবিচার অত্যাচার, দুর্নীতি, দুঃশাসন ও ইংরেজদের গোলামী থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি ধূমকেতু নামক একখানা পত্রিকাও সম্পাদনা করতেন। প্রলয় শিখা, সাম্যবাদ, চিত্তনামা, মরুভাস্কর ইত্যাদি তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। বুলবুল, চোখের চাতক, চন্দ্রবিন্দু, সুরসাকী, জুলফিকার, গীতি শতদল প্রভৃতি তার এই গানের বই। ব্যথার দান, রিক্তের বেদন প্রভৃতি তা রচিত উপন্যাস। শিশুদের জন্য পুতুলের বিয়ে নামক একখানা নাটক ও তিনি রচনা করে গেছেন।

 

বাংলা সাহিত্যে যে কজন কোভিদ আবির্ভাব ঘটেছে কাজী নজরুল ইসলাম তার অন্যতম।  প্রেম ও বিদ্রোহ এ দুটি শক্তিশালী ধারা তার কাব্যের সমানভাবে প্রবাহমান। মোমো একহাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশি আর এক হাতে রোনত ধৈর্য কবি নজরুল একদিকে বাসের বাশরীর ললিত সুরে চির সুন্দরের সাধনা করেছেন এবং অপরদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের অগ্নি সৈনিকরূপে রণতুর্য নীলাদ করেছেন। নর  নারীর  হৃদয় লীলা তাকে যেমন বিহবল করেছে, তেমনি মানুষের শোষণ ও শাসনের নির্মমতা তাকে বিক্ষুদ্ধ এবং বিদ্রোহী করে তুলেছে। তিনি কখনো বিদ্রোহী, কখনো প্রেমিক, কখনো প্রকৃতির পূজারী ,আবার কখনো বা  মরমী সাধক। বাস্তবি কই কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বিচিত্র প্রতিভার অধিকারী।  বিষয়ানুগ ভাষা ব্যবহার, উপমা ,রূপক, উৎপেক্ষা ও সমাসোক্তি অলংকারের শিল্পীত সৃজন এবং ভাবের অন্তরাশ্রয়ী গীতিময় গতিবেগে নজরুলের কাব্যধারা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নির্মাণ।

Views: 10

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *