বাংলা সাহিত্যের পরিচিতি

বাংলা সাহিত্যের পরিচিতি

বাংলা সাহিত্যে
বাংলা সাহিত্যে

 বাংলা সাহিত্যে ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি সময়ের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ বিস্তীর্ণ জনপদের বৈচিত্র্য জনগোষ্ঠীর সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা নিয়ে রচিত এক বর্ণাঢ্য সাহিত্য সৃষ্টির ইতিহাস।  পন্ডিতের মতে- বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হাতে রচিত চর্যাপদ থেকে এর যাত্রা শুরু।  কালের বিবর্তনের ধারায় বাংলা সাহিত্য বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের অন্যতম বলে মজাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে।  একটি বিশেষ ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটলেও রাজনৈতিক পটভূমিকায় শেষ সীমারেখার পরিবর্তন ঘটেছে।  বিচিত্র পরিবেশে গড়ে উঠেছে এর ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী। হলে বিচিত্র মানুষের সুখ দুঃখ, হাসি কান্না, আনন্দ বেদনার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে বাংলা সাহিত্যের মধ্যেও এসেছে বৈচিত্র।

বাংলা সাহিত্যের যুগ

 যথেষ্ট মত পার্থক্য থাকলেও চর্যাপদের সূচনা থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক এর তিন যুগে ভাগ করা যায়। প্রাচীন যুগ ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

মধ্যযুগ ১২০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এবং আধুনিক যুগ ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই তিন যুগের সাহিত্যিক বাংলার শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ

 বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের নিদর্শন চর্যাপদ।  ১৯৬০ সালে নেপালের রাজ দরবারে অতি শালা থেকে মহাদেয় হরপ্রসাদ ছাত্রী হাজার বছরের পুরান বুদ্ধদেবের কিছু সাধন সংগীত আবিষ্কার করেন যাহা চর্যাপদ নামে খ্যাত। চর্যাপদের ভাষা হাজার বছরের পুরনো বাংলা ভাষা বলে পন্ডিতরা মনে করেন।  এর রচনাখাল নিয়ে পন্ডিতের মধ্যে মতভেদ আছে। ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে-  চর্যাপদ ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রচিত। আবার কেউ কেউ মনে করেন ৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হয়েছিল চর্যাপদ। পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এগুলোর নাম দিয়েছিলেন “চর্য্যাচয্য বিনিশ্চয়’’। চর্যাপদ বুদ্ধ সাধকদের গূঢ় সাধন প্রণালী। প্রাচীন বাংলা ভাষা রয়েছে তো এর পদগুলো যেমন সাহিত্য মূল্য বিদ্যমান, তেমনি প্রাচীন বাঙালি সমাজের চিত্র এতে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত। ধর্মনির্বর, আধ্যাত্মিক ও আত্মগত ভাবানুভূতি প্রধান বিষয়বস্তু অবলম্বনে আদি যুগের বাংলা সাহিত্য তৎকালীন সম্প্রদায়গত বিভেদ ও বিচ্ছেদ উপেক্ষা করে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো রূপ নিয়েছে। 

মধ্যযুগ

 ১২০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ বলা হয়।  ১২০০ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের সময়ের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের তেমন উল্লেখযোগ্য সাহিত্যের নিদর্শন পাওয়া যায় না বলে ওই সময় কালকে কেউ কেউ বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলেও উল্লেখ করতে চান। তবে ওই সময় রচিত যে সব নিদর্শন পাওয়া গেছে তাতে এ দাবির সততা স্বীকৃত হয় না। এদেশের মানুষের চিরাচরিত জীবন ব্যবস্থা, মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার জন্য এ সময় রচিত সব সাহিত্য হয়তোবা আধুনিক মানুষজনের হস্তগত হয়নি। প্রকৃত পৈঙ্গল, শূণ্য পুরাণ ও তার কলিমা জালাল বা নিরঞ্জনের রুষ্মা ডাক ও খনার বচন, শেকশুভোদয়া প্রভৃতি এ সময় রচিত সাহিত্য। মধ্যযুগের প্রথম নিদর্শন বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য। আনুমানিক ১৪ শতকের শেষার্ধে বা ১৫ শতকের প্রথমার্ধে কবি বড়ু চন্ডীদাস রাধা কৃষ্ণের প্রেম কাহিনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করেন। মধ্যযুগের সাহিত্যের নিদর্শন অসংখ্য। সেগুলোর বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য, জীবনী সাহিত্য, নাথ সাহিত্য,অনুবাদ সাহিত্য, রোমান্টিক প্রণয় ও উপখ্যান, লোক সাহিত্য, কবিগান ও দোভাষী প্রতি ইত্যাদি ছিল প্রদান। মধ্যযুগে আরাকানরা সভায় বাংলা সাহিত্যের চর্যা হত এবং সেখানকার মুসলমান কবিগণ ধর্ম সংস্কার মুক্ত মানবীয় কাহিনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন বৈশিষ্ট্যের সংযোজন করেন। মধ্যযুগীয় এ ধারার কবিদের মধ্যে দৌলত কাজী ও কবি আলাওয়াল ছিলেন প্রধান। শুধু তাই নয় শ্রী চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের ফলে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ নতুন সম্পদে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। শ্রী চৈতন্যের জীবনী অবলম্বনে রচিত হয় জীবনের সাহিত্য। তার প্রভাবে বৈষ্ণব ধর্ম ব্যাপকভাবে বিকশিত হয় এবং এর উপর ভিত্তি করে বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের বিপুল ভান্ডার গড়ে ওঠে। মধ্যযুগ শক্তপদাবলী, নাথ সাহিত্য, বাউল ও অপরাপোর লোকসঙ্গীতের প্রচার হয়। ময়মনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকা এ যুগেরই সৃষ্টি। এমনিভাবে ১২০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সু দীর্ঘ সময়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বৈচিত্র্যপূর্ণ সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল।

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ

বাংলা সাহিত্যে
বাংলা সাহিত্যে

 ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ শুরু।  এ সময় দেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটে।  কলকাতায় স্থাপিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। আধুনিক শিক্ষার প্রভাবে বাংলা জনজীবনে এক বিস্ময়কর জাগরণের সূত্রপাত হয়।  ইংরেজি সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য ও ভাবধারা বাংলা সাহিত্যেও প্রতিফলিত হতে থাকে। শুরু হয় বাংলা গদ্য চর্চা।  গদ্যের উৎকর্ষ সাধনের ফলে গদ্যনির্ভর সাহিত্য যেমন প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, নাটক সৃষ্টি হয়ে বাংলা সাহিত্যকে বৈচিত্রমুখী করে তোলে। এযুগের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমুখ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বলা হয় আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতি বাংলা সাহিত্যের কাঠামো শক্তিশালী হয়ে গড়ে ওঠে। মাইকেল মধুসূদন নাটকে দেখায় অসাধারণ কৃতিত্ব।  মাইকেলের বিষয়ক কবি প্রতিভা বাংলা সাহিত্যে যথার্থ আধুনিকতার সৃষ্টি করে। তাই ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আধুনিক পরিপূর্ণ লক্ষণ বাংলা সাহিত্যের প্রতিফলিত হয়েছে। মাইকেল তার অমর সৃষ্টি “মেঘনাদবোধ’’ কাব্যের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্যের ধারার প্রবর্তন করেন। অতঃপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবির্ভাবে বাংলা সাহিত্যের সর্বোত্তম বিকাশ ঘটে।  তার প্রতিভার যাদুর স্পর্শে বাংলা সাহিত্য বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের সমপর্যায়ে ভুক্ত হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যের বিকাশের ধারা প্রবাহমান।  বাংলা কবিতা, গান, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী ও জীবনী  সাহিত্য প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের সব শাখাই বিশ্বের অন্যান্য সাহিত্যের সাথে সমতালে অগ্রসরমান। রবীন্দ্রনাথের পর আধুনিক কবি শামসুর রহমানের হাত ধরে বাংলা কবিতা উপনীত হয়েছে নতুন দিগন্তে।  কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিল বিভূর্তিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণুদে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রমুখ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

সাহিত্য ভরা বড়ই জীবনের প্রতিফলন স্পষ্ট।  যুগে যুগে জীবনের আদর্শের পরিবর্তন হয় পরিবর্তন হয় সাহিতেরও। যোগ ধর্মকে সাহিত্য স্রষ্টা অস্বীকার করে না।  প্রাচীন যুগের বাংলা সাহিত্যের তেমন গৌরব না থাকলেও মধ্যযুগে এসে বাংলা সাহিত্য প্রাণশক্তি অজর্নের সক্ষম হয়েছিল। তবে প্রকৃত প্রস্তাবে আধুনিক যুগেই বাংলা সাহিত্য বৈচিত্র্য, উৎকর্ষ ও ভাষার বিবর্তনের গোরবান্বিত হয়ে উঠে। আধুনিক সভ্যতা, উন্নত জ্ঞান, বিজ্ঞান, কৃষ্টি, সংস্কৃতি প্রবৃত্তি প্রভাবে আধুনিক বাংলা সাহিত্য উন্নতির পথে অগ্রসরমান।

Views: 11

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *