জনসংখ্যার সমস্যা ও তার প্রতিকার

জনসংখ্যার সমস্যা ও তার প্রতিকার

জনসংখ্যার সমস্যা ও তার প্রতিকার
জনসংখ্যার সমস্যা ও তার প্রতিকার

অর্থনৈতিক উন্নয়নের জনসংখ্যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই জনসংখ্যার দেশের জন্য আশীর্বাদ কিন্তু অতিরিক্ত জনসংখ্যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধার সৃষ্টি করে। দ্রুত ও অধিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে দেশের ভোগের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, সঞ্চয় ও মূলধন গঠনের হার কম হয়, বিনিয়োগ হ্রাস পায় এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর ফলে দারিদ্র্য বেকার সমস্যা জনগণের মাথাপিছু আয় কম ও জীবনযাত্রার মান ক্রমশ নিম্নগামী হয়। বাংলাদেশে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষার, চিকিৎসা ও বেকার সমস্যা ইত্যাদি প্রকট আকার ধারণ করেছে। জনসংখ্যার আধিক্যই এসব সমস্যার কারণ।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার হার ও ঘনত্ব

জনসংখ্যার সমস্যা ও তার প্রতিকার
জনসংখ্যার সমস্যা ও তার প্রতিকার

জনসংখ্যার ঘনত্ব বলতে প্রতি বর্গমাইল এ কতজন লোক বাস করে তাকেই বুঝায়। কোন দেশে জনসংখ্যা ঘনত্ব সেই দেশের জলবায়ু, বৃষ্টিপাত, ভূমির উর্বরতা ভূ প্রকৃতি শিল্পীর বিভিন্ন অবস্থার উপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাধিক গণবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এদেশে প্রতি মিনিটে প্রায় ৫ জন শিশু উপবিষ্ট হয়। যেমন মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে চতুর্দশমিক পাঁচ ও চতুর্দশ চারজন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ২১.১ জন। ৫৬,১৫৬ বর্গমাইল আয়তন বিশিষ্ট রাষ্ট্রের ১৬ কোটি মানুষ বাস করে। সুতরাং বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে পৃথিবীর ঘনবসতিপূর্ণ অন্যতম দেশ।

 জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ

বাংলাদেশের জনসংখ্যার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ এ অঞ্চলে জলবায়ু ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। উষ্ণ জলবায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশের জনসাধারণ অল্প বয়সে সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা ধারণ করে। এদেশের অধিকাংশ লোক অশিক্ষিত অদুরদর্শী। তারা জন্মনিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে অক্ষম। দেশে বাল্যবিবাহ ও বহু প্রচলিত আছে ফলে জন্মহার বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবেশ অধিক জন্মহারের জন্য দায়ী।

 জনসংখ্যা বৃদ্ধি জনিত সমস্যা

জনসংখ্যার সমস্যা ও তার প্রতিকার
জনসংখ্যার সমস্যা ও তার প্রতিকার

দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ফলে বাংলাদেশের জনসাধারণের মাথাপিছু আয় এবং জীবনযাত্রা নিম্নগামী। দেশের বেকার ও অর্ধ বেকার সমস্যা আক্রমশ জটিল আকার ধারণ করেছে ।ভোগ বৃদ্ধির ফলে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কৃষির উপর ক্রমাগত চাপ পড়েছে। জমিগুলো ক্রমশুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ায় যান্ত্রিক চাষ পদ্ধতি করা যাচ্ছে না। ফলে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে প্রতি বছর খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয় বলে শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি করা  সম্ভবপর হচ্ছে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধি হেতু আবাসিক সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার উপর তীব্র আঘাত এসেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেকার সমস্যা, সন্ত্রাস ইত্যাদি জনসংখ্যার বৃদ্ধিজনিত সমস্যারই আওতাভুক্ত। অত্যধিক জনসংখ্যার চাপে বাংলাদেশের মানুষ আজ দুর্দশা গ্রস্থ এবং নানা প্রকার সমস্যার জর্জরিত।

 মেলথাসের মত

প্রকৃত অর্থনীতিবিদ মেলথাস তার প্রচারিত জনসংখ্যা তত্ত্বে বলেছেন কোন দেশের আত্মিক অসচ্ছলতার প্রধান কারণ অতিরিক্ত জনসংখ্যা। মানুষ স্বভাব তো গুরুত্বের প্রগতিতে জন্মহার বৃদ্ধি করে চলে আর তার জীবিকার সংস্থান বাড়ি সমান্তর প্রগতিতে। ২৫ বছরের দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ওঠে এবং কাল ক্রমে এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি হয় যখন দেশের লোক সংখ্যা জীবিকার সংস্থানের সকল উপায়কে অনেক দূর অতিক্রম করে যায়। তখন জনসাধারণের জীবনযাত্রার মান একান্ত নিম্ন স্তরে নেমে আসে। দেশে দেখা দেবে ব্যাপক দারিদ্র্য ও খাদ্যাভবন। তবে উন্নত দেশগুলোতে এ তথ্য ও যথেষ্ট সার্থকতা প্রতিপন্ন না করাতে পারলেও, এশিয়ার দেশসমূহে এর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে।

জনসংখ্যার সমস্যার সমাধান

 পরিবার পরিকল্পনাঃ দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে এভাবে আর বাড়তে দেওয়া যায় না। তাই একে পরিকল্পিত উপায়ে রোধ করতে হবে। দেশের সবাইকে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করে নিজেদের সংসারকে অভাব দারিদ্র ও শিক্ষা ও সুস্থতা মুক্ত রাখতে হবে। পরিবার পরিকল্পিত হলেই জাতীয় পর্যায়ে এর সুফল পাওয়া যাবে। কারণ জনসংখ্যার হার কমলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর বাধাগ্রস্ত হবে না।

০১। ধর্মান্ধতা পরিহারঃ দেশের মানুষকে কুসংস্কার মুক্ত হতে হবে ধর্মচিন্তেকে যুগের সঙ্গে সংগতি বিধান করে বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে চলতে হবে আপামর জনগণকে।

০২। শিক্ষাঃ যতই ব্যবস্থা নেওয়া হোক যাদের জন্য ব্যবস্থা তারা যদি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তায় উপলব্ধি করতে না পারে তবে কোন লাভ নেই। অশিক্ক্ষা এর মূল কারণ। দেশের শিক্ষিত মানুষের কাছে পরিবার পরিকল্পনা বোঝানোর দরকার হয় না। শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে তাদের মধ্যে সমস্যাটি উপলব্ধি করাতে হবে।

 ০৩। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহঃ সামাজিকভাবে সম্ভব না হলে কঠোর আইন প্রয়োগ করে হলেও বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধ করতে হবে। জনসংখ্যার বৃদ্ধি হার তাতেও কমবে।

 ০৪।জাতীয় আয়ের বন্টন ব্যবস্থাঃ জনসাধারণের মধ্যে জাতীয় আয়ের সুসংগঠন হলে অর্থাভাব অনেক কমে যাবে এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

 ০৫। শিল্পায়নঃ কুটির শিল্পের উন্নতি করে এবং বৃহদায়তন শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে দেশের জন্য সমস্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করতে হবে।

০৬। জনসংখ্যার পূর্ণ বন্টনঃ দেশের বিভিন্ন অংশে জনসংখ্যার সমান বন্টন ব্যবস্থা করতে পারলে এ সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে। সরকারের গৃহীত পন্থা গুলোর মধ্যে কৃষি উৎপাদন গঠিত করা এবং জন্মহার কমানোর কার্যক্রম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। কৃষি ফলন বাড়িয়ে শিল্পের প্রসার গুটিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়িয়ে অবাধে এই ক্রমবদ্যমান জনগণের জীবিকার সংস্থান করা যেতে পারে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি জনিত সমস্যা দু দিক থেকে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। একদিকে দেশের সর্বাঙ্গীর উন্নতি অন্যদিকে কৃষিকাজে আধুনিক যন্ত্রপাতির সরবরাহ, উৎকৃষ্ট বীজ ও সারের যোগান ব্যাপক সেচ ব্যবস্থা, সহজলভ্য কৃষি ঋ,ণ সমবায় মূলক চাষাবাদ পদ্ধতির প্রসার, কুটির শিল্পের উন্নতি এসব ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগিত হবে। তাছাড়া দেশের শিল্প উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় সম্পদ বাড়ানো যায়।

তবে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার না কমলে সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যাবে।  পরিবার পরিকল্পনার মাধ্যমে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার কমাতে পারলে এ জাতির অস্তিত্ব রক্ষা করা অসম্ভব।

 

বর্তমান বাংলাদেশের যে অস্বাভাবিক ও দ্রুত হারে জনসংখ্যার বৃদ্ধি পাচ্ছে তাকে বিস্ফোরণের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।  জনসংখ্যার এই বিস্ফোরণ জাতির জন্য মহা বিপদ সংকেত।  সভার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।  দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার, সর্বোপরি পরিকল্পিত পরিবার গঠনের মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান একান্ত অপরিহার্য। 

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার

Views: 17

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *