কুটির শিল্প ব্যবসা

কুটির শিল্প ব্যবসা

কুটির শিল্প
কুটির শিল্প

‘’মায়ের দোয়া মোটেও কাপড় মাথায় তুলে নেরি ভাই।’’

‘’ছেড়ে দাও রেশমি চুড়ি বঙ্গনারী কবু হাতে আর করোনা।’’

রবীন্দ্রনাথ ও মুকুন্দ দাস ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে  বেশি পণ্য ব্যবহারে সবাইকে উৎসাহিত করার জন্য উপরোক্ত মন্তব্যগুলো করেন।

স্বল্প বুজে খাটিয়ে ঘরে বসে হাতে বা হস্তা চালিত যন্ত্রের সাহায্যে যেকোনো তৈরি করা হয় তাকে কুটির শিল্প বলা হলেও শিল্পগুনের বিচারে এগুলো লোক শিল্পের মধ্যে গণ্য।  বাংলাদেশের কুটির শিল্প জাতির পণ্য একসময় সমগ্র বিশ্বের বিশ্বাস ছিল। পৃথিবীর বহু দেশেই ভারী শিল্পের পাশাপাশি কুটির শিল্প রয়েছে।  তাই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নকামী দরিদ্র দেশে যেখানে বাড়ি শিল্পের প্রসার ঘটানো দুরুহ ব্যাপার সেখানে কুটির শিল্প বা লুট শিল্প রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা।

  লোকশিল্পের বৈশিষ্ট্য

কুটির শিল্প
কুটির শিল্প

লোক শিল্প জাত পন্নের বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো তৈরিতে ভারী শিল্পের মতো যন্ত্রপাতি বা অধিক বজির প্রয়োজন হয় না।  তাই এদের উৎপাদন  খরচ পরে কম। ফলে বিক্রি হয় কম মূল্যে।  কারখানার যন্ত্রের মত এখানে অল্প সময়ে একসাথে অধিক সংখ্যক দ্রব্য তৈরি করা যায় না। কিন্তু শিল্পীর হাতে উৎপাদিত শিল্প দ্রব্য সুন্দর, আকর্ষণীয় ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। 

কুটির শিল্প ও আমাদের অর্থনীতি

Bangladesh statistied year book(1993) অনুসারী বাংলাদেশে ২.১২ লক্ষ তাত শিল্পী ৫.১৪  লক্ষ Loon চালু রয়েছে এবং ১০ লক্ষ লোক এ শিল্পী নিয়োজিত রয়েছে। অন্যান্য লোক শিল্পের মধ্যে প্রায় ১.৭০ লক্ষ ইউনিট রয়েছে এবং এগুলোতে প্রায় ৬ লক্ষ লোক কাজ করে।  তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের শ্রমশক্তি এক বিরাট অংশ লোক শিল্পে নিয়োজিত।  যা আমাদের অর্থনীতিকে দারুন ভাবে উপকৃত করেছে।

বাংলাদেশের লোকশিল্পর জাত সাধারণ পণ্য সমূহ

কুটির শিল্প
কুটির শিল্প

বাংলাদেশ হল কৃষ্টি আর কালচারের দেশ।  লোকশিল্প এ দেশের দৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।  এদেশের সাধারণ লোকজ পণ্যগুলো হলো মুসলিম, নকশিকাথা, মাটির দ্রব্যাদি ,খাসা বা পিতলের দ্রব্যাদি, চিরুনি, বোতাম, দা, কোরাল, ছুরি, কাঁচি, সোনা রুপার অলংকার ,নানা রকম খেলনা, পুতুল, পার্টি ,বাদ্যযন্ত্র, ঝিনুক, চুরি, কাঠ শিল্প, মিষ্টান্ন দ্রব্যাদি, লুঙ্গি, গামছা, রুমাল, ধুতি, তোয়ালে, বেনারসি, জামদানি, মশারি, হাতপাখা, ফুলদানি ইত্যাদি। 

বিশেষ ঐতিহ্য সম্পূর্ণ কিছু লুকস পণ্য মুসলিম

ঢাকার মুসলিম শুধু বাংলাদেশের নয় গোটা বিশ্বে বিখ্যাত ছিল।  শোনা যায় বৃহৎ আকারের একটি শারীর আংটির ভেতরে দিয়ে অতিক্রম করানো যেত।

 নকশি কাঁথাঃ জসীমউদ্দীনের নকশি খাতার কথা আমরা সবাই জানি।  বাংলার গ্রামে গ্রামে নকশীকাঁথা তৈরি ছিল মহিলাদের রেওয়াজের বিষয়। একটা সাধারন নকশি কাঁথা বুনতেও ছয় মাস সময় প্রয়োজন হয়। শিল্পী কামরুল হাসান এর ভাষায় শুধু কতগুলো সুক্কস্যালয় আর রংবেরঙের নকশার জন্যই নকশি খাতা বলা হয় না। বরং খাতার প্রতিটি শোচের ফোঁড়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে এক একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবন গাঁথা। 

মৃৎশিল্পঃ  আমাদের মৃৎশিল্প কম ঐতিহ্যের অধিকারী নয়। এদেশের গ্রামের মানুষ এখনো মাটির তৈরি হাড়ি, পাতিল, বাসন-কোসন, কলসি ,সানকি আজও নিত্য ব্যবহার করে থাকে।  এছাড়া দুর্গা সরস্বতী লক্ষ্মী ইত্যাদি তৈরির কাজেও আমাদের মৃৎশিল্পীরা ব্যস্ত থাকেন সারা বছর। 

শীতল পাটিঃ সিলেটের শীতলপাটি বেতের চেয়ার, শোফা ও অন্যান্য পণ্যের প্রশংসা করার প্রয়োজন পড়ে না।  এছাড়া বাঁশের তৈরি ঝুড়ি কোলা মাছ ধরার যন্ত্রপাতি খুবই পরিচিত। 

চামড়ার শিল্পঃ  চামড়া তৈরির জুতা, মানিব্যাগ, সুটকেস, হ্যান্ড ব্যাগ ইত্যাদির চাহিদা দেশের বাইরেও প্রচুর।  এছাড়া চটের তৈরি ব্যাগ শিকা ধরি ইত্যাদি পণ্যের শিল্পগুণ অতুলনীয়।

সিল্ক শিল্পঃ  বাংলাদেশের রাজশাহী, ময়মনসিংহ ,পাবনা, বগুড়া জেলার রেশন চাষ হয়।  রাজশাহী সিল্ক অত্যন্ত প্রসিদ্ধ।

 বেত ও বাঁশ শিল্পঃ দেশের বাঁশ, বেত দ্বারা চেয়ার, টেবি, ঝুড়ি, মাদুর, অন্যান্য ব্যবহৃত দ্রব্য এ শিল্পে তৈরি হয়।  ঢাকা, বরিশাল, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও খুলনায় শিল্পসমূহ প্রসিদ্ধ লাভ করেছে। 

কুটির শিল্পের অতীত গৌরব

কুটির শিল্প
কুটির শিল্প

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়

 বাংলার মুসলিম বোগদাদ, রোম, চীন

কাঞ্চন তৌলেই কিনতেন একদিন।’’

বিখ্যাত বাংলাদেশের মুসলিম সম্পর্কে ইহা কোভিদ প্রশস্তি অতিশায়ক্ত নয় মোটেও। এদেশের বুনান ও মুসলিম ছিল তৎকালীন মুসলিম  বাদশাদের বিলাসের বস্তু। মুসলিম ও অন্যান্য কুটির শিল্প জাতপন্ন কেবল এ দেশবাসীর অভাব মোচন করতো না বরং বিদেশ থেকেও প্রচুর অর্থ আহরণ করে জাতীয় ধন ভান্ডার কে সমৃদ্ধ করতো। বস্তুত এর মূলে ছিল কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সামঞ্জস্যতা।  শিল্পের উৎপাদন কর্তব্য পণ্য আর কৃষকরা খাদ্য উৎপাদন করে একে অপরের চাহিদা পূরণ করতো। দেশবাসীকে বাইরের কিছু জন্য তাকিয়ে থাকতে হতো না।  দেশ ছিল স্বচ্ছল ও ভাবমুক্ত।

 লোকশিল্পে বর্তমানে অবস্থা

দিন যাচ্ছে আর আমরা হচ্ছি বিদেশমুখী।  বিদেশী জিনিসের কৃত্রিম চাকচিক্য দেখে আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য।  মায়েরা এখন আর মাটির হাঁড়িতে ভাত রান্না করতে চান না। আমরা এখন আর মেহমানদেরকে নকশীকাঁথায় বসতে দিতে রাজি নই। এভাবে হয়ে পড়েছি বিদেশি সংস্কৃতির একনিষ্ঠ ভক্ত।  আর আমাদের লোক শিল্পের বাড়ছে বারোটা।  বাংলাদেশের কুটির শিল্প এখন মুমূর্ষ, শিল্পীরা হতোদ্যম। কুটির শিল্পের অতীত গৌরব কাহিনী এখন কিংবদন্তিতে পর্যবসিত।

 লোকশিল্প সংরক্ষণের উপায়

এ দেশের লোক শিল্পীরা এখনো একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি।  এখনো দেখা যাবে দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অগণিত শিল্পী।  এরা এখন প্রায় বেকার, চরম অবহেলায় দিন কাটাচ্ছে। যথার্থ উৎসাহ ও উদ্দীপনার মাধ্যমে কেবল সম্ভব এদেরকে উজ্জীবিত করা।  আর এজন্য প্রয়োজন এসব পণ্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা। প্রদর্শনীর মাধ্যমে তা করা সম্ভব।  তাছাড়া উৎসাহীদেরকে কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনে আর্থিক সাহায্য ও সহজ স্রোতে ঋণদানের মত কাজ এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বোপরি আমাদেরকে দেশীয় পণ্যদ্রব্য ব্যবহারের মত মন মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

 বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কুটির শিল্পের ভূমিকা

০১। কর্মসংস্থান শিল্পঃ বাংলাদেশের ৪৭% কর্মক্ষম জনসাধারণের মধ্যে ৩৩% বেকার।  বেকার সমস্যা জজরিত আমাদের যুব সম্প্রদায় আজ হতাশাগ্রস্থ। অথচ লোক শিল্প একটি সম্ভাবনাময় শিল্প।  এর শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনতে বিশাল অবদান রাখতে পারে।

০২। স্বনির্ভরতা ওজনের লোকশিল্পঃ  গ্রামীণ মহিলারা এবং স্বামীহীন ও বাস্তব ভিটামিন মহিলারা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে নিজের মাধ্যমে পরিবারে স্বনির্ভরতা আনতে পারে। যা সামাজিক অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে।

০৩।  বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ে লোকশিল্পঃ বাংলাদেশের রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় বাণিজ্য ভারসাম্য অনেক বেশি।  কিন্তু এ শিল্প জাতীয় দ্রব্যের রপ্তানির মাধ্যমে ভারসাম্য কমানো যায়।

০৪।  স্বল্প বিনিয়োগযোগ্যঃ লোকশিল্পে শ্রমের মাথাপিছু মূলধন বেয়ে ১৫ হাজার টাকা এবং অন্যান্য শিল্পে একাকার পরিমাণ পাঁচ হাজার টাকার উর্ধ্বে নয়।  সেখানে প্রায় এক কোটি ২০ লক্ষ লোক বেকার, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কম মূলধন ব্যর্থ লোক শিল্প অবদান রাখবে এ কথা বলা যায়।

বেকারত্বের অভিশাপে জযরিত আমাদের দেশের অসংখ্যা মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেবলমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যই নয়, এ লোক শিল্প আমাদের জাতীয় রুচি, কৃষ্টি রীতি ও দেশপ্রেমের পরিচয় বহন করে। যে জাতি আপন চিন্তা, চেত,না তথা নিজ দেশ জাতি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সম্পর্কে সচেতন নয় তার পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রথমে চাই নিজের পরিচিতি, তারপর অন্যের সাথে সম্পর্ক। আর এজন্যই আমাদের লোকশিল্পকে পুনরুদ্ধার, আরো শক্তিশালী, উন্নত ও সময় প্রসারিত করার দরকার এবং দরকার জরুরী ভিত্তিতে সরকারি হস্তক্ষেপ। 

Views: 17

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *