আত্মনির্ভরশীলতা হওয়ার উপায়

আত্মনির্ভরশীলতা হওয়ার উপায়

আত্মনির্ভরশীলতা
আত্মনির্ভরশীলতা

স্বাবলম্বন মানব জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুন। স্বাবলম্বন কথাটির অর্থ হল স্ব অবলম্বন বা আত্মনির্ভরশীলতা। অন্যের উপর নির্ভরশীল ও সাহায্য বা সহযোগিতার প্রত্যাশা না করে নিজের মেধা বুদ্ধি ও বিবেক এবং নিজের হাতকে কাজে লাগিয়ে জীবনের সর্বস্তরে সাফল্য অর্জন করা হলো স্বাবলম্বন বা স্বনির্ভরতা। অর্থনৈতিক নির্ভরতা বলতে কোন দেশকে অন্য দেশের সাহায্যের উপর নির্ভর না করা বোঝায়। প্রকৃত লেখক ইসমাইল হোসেন সিরাজী এ প্রসঙ্গে বলেছেন আত্মশক্তির উপর যারা শ্রদ্ধা আছে সে একদিন যতই বিলম্বে হোক না কেন গগন মারগে শিরো উত্তোলন করবে বস্তুত বিশাল পৃথিবীতে কোন দেশ বা কোন জাতি সার্বিকভাবে যাতে না হয় সেটাই মূর্খ বিষয় নির্ভরতা আমাদের সেই শিক্ষাই দে যাতে জাতীয় সমৃদ্ধিতে সমৃদ্ধশালী হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি নয় বরং প্রয়োজনের বিনিময়ের মাধ্যমে কোন কিছু চাওয়া ও পাওয়া যেতে পারে।

স্বাবলম্বন শিক্ষা

আত্মনির্ভরশীলতা
আত্মনির্ভরশীলতা

অন্য সব কাজ শিখতে হলে অনুশীলনের প্রয়োজন হয় তেমনি স্বাবলম্বনের জন্য প্রয়োজন অনুশীলনের। বাল্যকাল হতে সংলগ্ন শিক্ষার উপযুক্ত সময় স্কুল জীবন থেকেই এই গুণটি আয়ত্ত করার চর্চা করতে হয়। বৃহৎকর্ম ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সাবলম্বনের প্রয়োজন সর্বাধিক। নিজের শক্তি ও সামুদ্রের উপর বিশ্বাস রেখে যোগ সংসারের সমস্যাগুলোর সমাধান নিজে নিজেই করে নিতে হবে। দুঃখ, কষ্ট, আপদ, বিপদ অগ্রাহ্য করে জীবনের লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হইলে হইতে পারলে মনে আত্মবিশ্বাস জন্মে এবং সাবলম্বী হওয়ার অনুপ্রেরণা জাগে। অলসতা ও দীর্ঘশক্তি তা স্বাবলম্বনের ঘুর শত্রু মনোবল নিয়ে এগুলো পরিহার করতে হবে। যতদূর সম্ভব জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে পরনির্ভরতা ত্যাগ করে স্বাবলম্বী হবার চেষ্টা করতে হবে।

স্বনির্ভরতার প্রয়োজনীয়তা

আত্মনির্ভরশীলতা
আত্মনির্ভরশীলতা

কোন দেশ ও জাতির জন্য স্বনির্ভরতা যেমন অংশ ৮০ বছরও তেমনি পরনির্ভরতা অভিশাপ স্বরূপ। অর্থনৈতিক পরনির্ভশীলতা ব্যক্তি ও জাতির আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মবিশ্বাস যেমন বিনষ্ট করে, তেমনি তার কার্যতম শিথিল করে দেয়। তাই প্রত্যেক দেশ ও জাতির জন্য স্বনির্ভরতা প্রয়োজন ও গুরুত্ব সর্বাধিক।

অবশ্য বর্তমান বিশ্বের ব্যাপক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পরিপ্রেক্ষিতে কোন দেশ বা জাতি অন্য কোন দেশ বা জাতির সাহায্য বা সহযোগিতা না নিয়ে নিজের অস্তিত্ব অসম্পন্নভাবে রক্ষা করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে আমেরিকার কথা বলা যেতে পারে। আমেরিকা আজ ঐশ্বর্য পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশ আমেরিকার সাহায্যের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। অথচ আমেরিকা মধ্যপ্রাচির তেল সম্পদের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। উৎপাদনে রাশিয়া আমেরিকার চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে অথচ রাশিয়াকে অনেকাংশে নির্বাচন থাকতে হয় আমেরিকার খাদ্য শস্যের উপর। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধবস্ত জাপান ও জার্মানি উৎপাদন বৃদ্ধি তথা স্বনির্ভরতা অর্জনের বিস্ময়কর অগ্রগতি সাধন করেছে। উন্নয়নশীল দেশসমূহের মধ্যে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত তার উন্নয়ন কর্মকান্ডকে ত্বরান্বিত করার জন্য বিদেশী দ্রব্য আমদানি বন্ধ করে দিয়ে দেশের জনশক্তি ও পুঁজিকে কাজে লাগিয়ে মিলকারখানায় এত উন্নয়ন সাধন করেছে যে, বর্তমানে তাদের দ্রব্য সামগ্রী মধ্যপ্রাচ্যের সম্পূর্ণ বাজার দখল করে রেখেছে।

সুতরাং প্রতিযোগিতামূলক এ বিশ্বে আত্ম সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে আমার দিকে আত্মবিশ্বাস ওজন করতে হবে। আমাদেরকে ওজন করতে হবে আত্মনির্ভরশীলতা অর্থনৈতিক সহনির্বরতা অন্যের সাহায্য বা সহযোগিতা আমরা গ্রহণ করব ঠিকই কিন্তু তার মাত্রা সম্পর্কে আমরা সবসময় থাকবো সচেতন। অন্যের মুখের দিকে না তাকিয়ে আমরা সব সময় নিজের হাতের দিকে থাকাবো। আমাদের মেধা শক্তি বিপুল জনের শক্তি প্রাকৃতিক সম্পদ, আত্ম সচেতনতা ও কর্মতৎপরতা অবশ্যই একদিন আমাদের স্বনির্ভর করে তুলবে।

আমাদের অবস্থান

আত্মনির্ভরশীলতা
আত্মনির্ভরশীলতা

প্রায় ২০০ বছর ইংরেজদের সুসন ও ২৫ বছর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের অর্থনীতিকে যথেষ্ট ক্ষতি করেছে। অনদিকে দেশে  জনসংখ্যা বেড়েছে অত্যন্ত  দ্রুত গতিতে। তাছাড়া প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, খরা ও জলোচ্ছ্বাসে ফসলহানি হয়েছে প্রচুর। তাই দেশের খাদ্য-ঘাটতি দেখা দিয়েছে অত্যন্ত প্রকটভাবে। ফলে বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে দারুন ভাবে।

প্রতিবছর দেশ থেকে কাঁচামাল ও জনশক্তি রপ্তানি করে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রিত হচ্ছে তার সিংহভাগই বিনিয়াগ হচ্ছে খাদ্যশস্য আমদানিতে। তাই দেশের কোন প্রকল্প অর্থের অভাবে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা যাচ্ছে না। কৃষি ক্ষেত্রে ফসল বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সার আমাদের দেশে নেই। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রয়োজনের যন্ত্রপাতির জন্য আমাদেরকে বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। বিশেষ জ্ঞানের জন্য আমরা বিদেশের মুখাপেক্ষী এসব সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত হবে না।

গৃহীত পদক্ষেপ

বর্তমানে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য দেশে দেশে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষভাবে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন সাধনে সরকার কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি প্রয়োগ করে উন্নত সার ও বীজ ব্যবহার করে এবং শেষ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে তিনটি ফসল উৎপাদন করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য সাইনর্ভর ঢাকা, উর্বরাময়মনসিংহ, সবুজ কুমিল্লা, শ্যামল সিলেট ইত্যাদি নামে বিভিন্ন জেলায় উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশে বর্তমানে সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে খাদ্য সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে।

সরকারি গৃহীত পদক্ষেপে বর্তমানে গ্রামে গ্রামে পতিত ও শুকিয়ে যাওয়া পুকুরগুলো সংস্কার করে মৎস্য চাষ বারবার আদেশ দেওয়া হয়েছে। রাস্তার দু ধারে বৃক্ষরোপণ অভিযান, জোরদার করে ফলমূল ও জালানির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। কুটির শিল্পকে সারা দেশে পুনর্জীবিত করার চেষ্টা চলছে। দেশের বেকার জন্য খাদ্য কর্মসূচির অধীনে এনে ভিখ।ষুকের হাতকে কর্মীর হাতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। হাঁস মুরগির খামার ও পশু পালনের প্রতি দেশের জনসাধারণকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য শহরে গ্রামে পরিবার পরিকল্পনাকে জোরদার করা হচ্ছে। যৌতুক প্রথা বিরোধী আইন প্রণয়ন করে তা জাতীয় জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা চলছে। নিরক্ষরতা দূরীকরণের মাধ্যমে শিক্ষিত জনশক্তি গড়ে তোলার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলেছে। কৃষি ঋণ ও সমবায় ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করে জনসাধারণকে সার্বিকভাবে স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সুতরাং আশা করা যায় ওদের ভবিষ্যতে আরও বাস্তবমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে নেয়া যাবে।

জাতীয় জীবনে শনিবার তা অর্জনের লক্ষ্যেই বর্তমানে দেশের সবুজ বিপ্লব কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, খাল খনন কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ অভিযান, নিরক্ষরতার দূরীকরণ, শিল্প বিপ্লব, প্রভৃত্তি পদক্ষেপ গৃহীত হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সরকারের করণীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি জনসাধারণের অংশগ্রহণেরও সাফল্যেও বহুলাংশে নির্ভরশীল।কৃষক যদি মাটি  শ্রম দান করে, সরকারি কর্মচারী যদি উন্নত বিজ ও সার সরবরাহ করে, তা নিয়েও প্রশাসন যদি সঠিকভাবে সততার ভিত্তিতে কার্যপ্রণালী তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করে,ছাত্র সমাজ যদি স্বেচ্ছা শ্রমিক ভিত্তিতে খাল খনন ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে সহযোগিতা করে,শ্রমিক যদি কল কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গঞ্জ যদি সততার ভিত্তিতে দেশের সার্বিক উন্নয়নে সঠিক পদক্ষে গ্রহণ করে, তবে আমাদের দেশ বিশ্বের মানচিত্রে সম্মানজনক একটি আসন গ্রহণে সক্ষম হবে। তাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন-

 “মুক্ত করো ভয়,

 আপনা মাঝে শক্তি ধরো নিজেরা করো জয়।’’

অধ্যবসায়

Views: 8

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *