অধ্যবসায় ও সফলতা

অধ্যবসায় ও সফলতা

অধ্যবসায়
অধ্যবসায়

 

 কোন মহৎ কর্ম সম্পাদনের জন্য ধৈর্য পরিশ্রম ও নিষ্কাশনকারী বারবার চেষ্টা করার নাম অধ্যাবসায়। মানুষ অসাধ্যকে সাধন করতে পারে অধ্যবসায়ের দ্বারা। জীবনের পথ অত্যন্ত কঠিন ও সমস্যা সংকুল। এ কঠিন সমস্যা ও সংকুল পথে অগ্রসর হয়ে জীবনের উন্নতি সাধন অধ্যাবসায় ছাড়া অসম্ভব।জীবনের প্রতি বাঁকে বাঁকে ব্যর্থতা, বিপর্যয় বাধা এবং বিপত্তি মানুষকে দুর্বল ও শক্তিহীন করে তুলতে পারে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা যায় অধ্যবসায়ের মাধ্যমে। তাই অধ্যবসায় মানব চরিত্রের এক মহুতি শক্তি। ইংরেজিতে একটি কথা আছে Failureis the pillar of success. অথ্যাৎ অধ্যাপসা থাকলে মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে। পৃথিবীতে এমন অনেক মহৎ কাজ আছে যা প্রথম উদ্যোগে সম্পন্ন নাও হতে পারে। প্রথম পরাজয় গ্লানিতে যে ব্যক্তি নিজেকে ব্যর্থ মনে করে কাজ ছেড়ে দেন তিনি কখনো জীবনে উন্নতি লাভ করতে পারেন না। এ জগত সংসারে বাধা ভিন্ন অতিক্রম করার শক্তি যার যত বেশি সাফল্য তার তত বেশি এবং জীবন যুদ্ধে জয়লাভ করার আশা তার তত অধিক। কাজেই কোন কাজে ব্যর্থ হলে নিরাশা না হয়ে পুনরায় দ্বিগুণ উৎসাহে সে কাজে সাফল্য লাভের আশায় মনোনিবেশ করা উচিত। এই অধ্যাবসায়ী মানুষকে সফলতা অর্জনের সাহায্য করে। অধ্যবসায় ব্যতীত মানুষ আকাঙ্ক্ষার চরম লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনা। ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায় যে, মানুষ অধ্যবসায়ের ফলেই জগতের সকল অসাধ্যকে সাধন করতে সক্ষম হয়েছে।

অধ্যাবসায়ের প্রয়োজনীয়তা

অধ্যবসায়
অধ্যবসায়

অধ্যাবসায় মানুষকে একনিষ্ঠ সাধনা ও বিচলিত নিষ্ঠা ধীরে সংকল্প ধৈর্যশীল ও পরিশ্রম করে তুলে। কোন কাজে সফলতা আসতে পারেনা  অধ্যবসায় ছাড়া। এ জগতে সাফ্য অর্জনের জন্যও প্রয়োজন অধ্যাবসায়ের। যা কিছু যত মূল্যবান, ততো দুষ্প্রাপ্য যত আকাঙ্ক্ষিত তাকে লাভ করার জন্যই চাই তত বেশি পরিশ্রম ও সাধনা দৃঢ় করতে হয়। তেমনি বারবার চেষ্টায় মানব ভাগ্যাকাশেও উদয় হয় সাফল্যের সুখ তারা। অধ্যাবসায়ীরা ব্যর্থ হয় না সাফল্য ছিনিয়ে আনে। দৃঢ় সংকল্প ধৈর্য্য ও সাহসিকতা সহকারে সাধনা করলে সাফল্যের স্বর্ণদ্বীপে পেৌছা সম্ভব। এ পৃথিবীতে যাদের জীবন সাফল্য এসেছে তা একদিন আসেনি। তারা পূর্ণ পূর্ণ চেষ্টা আর সাধারণ বলে গৌরবজনক সাফল্যের অধিকারী হয়েছিলেন। তাই মানব জীবনে অধ্যবসয়ের প্রয়োজনীয়তা অনস্মিকার্য।

 মানব সভ্যতায় অধ্যাবসায়

অধ্যবসায়
অধ্যবসায়

 এ পৃথিবী একদিনে মানবের বসবাসযোগ্য হয়নি। আজকের আধুনিক সভ্যতা এ সুন্দর পৃথিবী আমাদের পূর্বপুরুষধারী সাধনার ফসল। প্রাগৈতিহাসিক যুগে বডনচর জন্তুর মত মানুষজনের না ছিল ভাষা, না ছিল শিক্ষা, না ছিল পারিবারিক জীবন। সে গুহাবাসী মানুষেরা একটু একটু করে সভ্যতার পথে অগ্রসর হল। তারা আগুন জ্বালাতে শিখলো, ঘর বাঁধতে শিখলো। অধ্যব গুনেই গুহাবাসী মানুষের উত্তরসুরিরা আজ আরোহন করেছে সভ্যতার চরম শিখরে। যুগ যুগ ধরে মহা মনীষীদের সাধনা লব্ধ জ্ঞানের সমন্বয়ে আজ প্রকৃতি এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। মানব সভ্যতার এই বিরাট অগ্রগতি একদিনে হয়নি। এর পেছনে রয়েছে লক্ষ কোটি বছরের সাধনা আর অধ্যবসয়ের ইতিহাস।

ছাত্র জীবনে অধ্যাবসায়

অধ্যবসায়
অধ্যবসায়

ছাত্র জীবনে অধ্যবস এর গুরুত্ব অপরিসীম। বহু ছাত্রই পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল লাভের অসমাপ্ত হয়ে নিরাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা ভুলে যায় যে জগতের চেষ্টা ও সংগ্রাম ব্যতীত কোন কিছুই লাভ হয় না। আলস্য পরায়ণ ও শ্রমঘিমক ছাত্র কখনও বিদ্যা লাভ করতে পারে না। যে ছাত্র অধ্যবসায়ের তার অল্প মেধা শক্তি থাকলেও সে সফলতা অর্জন করতে পারে। বারবার চেষ্টা না করে ফেলে রাখে তার পক্ষে সেই অংক কোনদিন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। অপরপক্ষে অধ্যবসায়ী ছাত্র ঐ অংক সঠিকভাবে সম্পন্ন না হয় সেই পর্যন্ত আক্রমণের চেষ্টা করে থাকে।ফলে তার পক্ষে ওই অংক আয়ত্ত করা সহজ হয়ে যায়। তাই কবি বলেছেন 

‘’পারিব না’ পারিব না এ কথাটি বলিও না আর

 কেন পারিবে না তাহা ভাবো একবার।

 পাঁচ জনে পারে যাহা তুমিও পারিবে তাহা-

 পারো কিনা পারো কর যতন আবার।

 একবার না পারিলে দেখো শতবার।’’

অধ্যাবসায়ের দৃষ্টান্ত

স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস অধ্যবসের একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।তিনি অসংখ্য ইংরেজ সৈন্যের শহীদ বারবার পরাজিত হয়ে পলায়ন করতে বাধ্য হয়েও ইংরেজ বাহিনীকে পরাজিত করার বাসনা ও চেষ্টা পরিত্যাগ করলেন না। উপরন্তু ৬ বার রবার্ট ব্রোস যুদ্ধে পরাজিত হয়েও তিনি যুদ্ধ চিন্তায় নগ্ন আছেন। এমন সময় দেখতে পেলেন একটি মাকড়সা ক্রমে ক্রমে ৬ বার সূত্র স্থাপন করতে চেষ্টা করেও অকৃতকার্য হলো কিন্তু বিরক্ত না হয়ে সপ্তম বার চেষ্টা করল এবং তার ফলে মাকড়সাটি কৃতকার্য হলো। রবার্ট ব্রুস এই দৃশ্য দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে উঠলেন। আমিও মাকড়সা ন্যায় সপ্তম বারে কৃতকার্য হব। তিনি সপ্তম বার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হন এবং স্কটল্যান্ড এর উপর স্বীয় আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। তিনি যদি প্রথম বর্ষের পরিত্যাগ করতেন, তাহলে তার সময়েই স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা ইংরেজদের কবলিত হতো।

অধ্যাবসায়ের সাহায্যে জগতে বহু অসাধ্য কি সাধন করা সম্ভব হয়েছে। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার সম্ভব হয়েছিল অধ্যবস্যের কারণে। ভিয়েতনামবাসীদের আমেরিকা আগ্রাসন থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব হয়েছিল একমাত্র দৃঢ় মনোবল ও অধ্যবসয়ের ফলে। নেপোলিয়ান তার কার্যকলাপে রেখে গিয়েছেন অধ্যবসয়ের অজস্র নিদর্শন। কোন কাজকে তিনি অসম্ভব মনে করতেন না তিনি বলতেন- “Impossible is a word found in the dictionary of the folls.’’তিনি সামান্য এক দরিদ্র পরিবারের জন্ম নিয়েও একমাত্র অধ্যবসের গুণে ফরাসি জাতির ভাগ্যবিধাতার পদে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। তারা প্রত্যেকেই অধ্যবসায়ী ছিলেন। প্লেটু, এরিস্টোটল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকু,র কাজী নজরুল ইসলাম, মহাবীর আলেকজান্ডার, হযরত মোহাম্মদ সাঃ এর চরম পরীক্ষা দিয়েছিলেন বলে জগতে তারা ওমর হয়ে আছেন। জীবনে সার্থকতা ও সাফল্য লাভের জন্য আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ শুধু কল্পনা মাত্র। বাস্তবে যারা পরিশ্রমী ও ধৈর্যশীল তাদের হাতেই সাফল্যের চাবিকাঠি আসতে বাধ্য হয়।

অধ্যবসায়
অধ্যবসায়

ভলটিয়ার বলতেন প্রতিভা বলতে কিছু নেই। অধ্যবসাও সাধনায় সব সাফল্যের মূল। তাকে যখন লোকে প্রতিভাবান বলতো, তখন তিনি বলতেন তিনি পরিশ্রমী। চেষ্টার পরে চেষ্টা চালিয়ে তিনি তার সাফল্য অর্জন করেছেন। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু বহুকাল অধ্যবসায় সহকারে উদ্ভিদের চেতনা শক্তি ও স্পন্দন সম্বন্ধে তথ্য আবিষ্কার করেছিলেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসের অধ্যাবসায়ের গুনে মানুষের কর্ম  ও কৃতিরসাফল্যের বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এসব মহা মানুষদের চরিত্রে আমরা অধ্যবসায় বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত প্রবল ও ধীরও দেখতে পাই। এ বিশ্বে তারা খ্যাতি অর্জন করেছেন অধ্যবস এর গুণেই।

এ পৃথিবীতে মানুষের জন্য কোন কিছুই সহজলভ্য নয়। বিনা পরিশ্রমে কোন কিছুই মানুষ লাভ করতে পারে না। জগতে বিজ্ঞান শিল্প সাহিত্য প্রভৃতি সৃষ্টি ও রচনার পশ্চাতে রয়েছে মানুষের নীরবিচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ের অবদান। অধ্যবসয়ের গুণে মানুষ দীর্ঘ বুদ্ধি বিদ্যা বিচার ক্ষমতা স্মৃতিশক্তি প্রভৃতি লাভের সমাপ্ত হয়। অধ্যাবসায় বিমুখ মানুষ কখনো কোনো ব্যাপারে সাফল্য অর্জন করতে পারে না। বিশ্বে এই যে সভ্যতার বিশাল তিলোত্তমা মূর্তি এর পেছনে রয়েছে অসংখ্যা ব্যক্তির শ্রম ও অধ্যবসয়ের যোগফল। বস্তুত অধ্যবসায়ী ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে উন্নতির প্রকৃত সোপান। অধ্যবসায়ী মানুষেরই দেশ ও জাতির অমূল্য সম্পদ। তাই ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে সাফল্য আনতে হলে অবশ্যই অধ্যবসায়ী হতে হবে। সুন্দর দিন সবার জন্যই অপেক্ষা করে কেউ চেষ্টা করে ডেকে আনে, কেউ আনে না। আর এই আনা এবং না আনার সাথে অধ্যবসের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান।

নিরক্ষরতা দূরীকরণ

 

Views: 6

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *